একুয়া নিউজ
বাংলাদেশে একুশ শতকের লাগসই মৎস্য প্রযুক্তি বিকাশে

আমাদের দেশের সমুদ্র ব্যবস্থাপনা আর আমাদের অগোছালো পরিকল্পনা!

লেখকঃ সৃজন পাল   2018-06-10 03:38:17    Visited 189 Times

বইয়ের রাজ্য নামে খ্যাত ঢাকার নীলক্ষেতে একবার বই কিনতে গিয়েছিলাম। বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের লম্বা একটা ফর্দ তৈরী করা হয়েছিল। সে তালিকায় বিদেশী রাইটার আর সায়েন্টিফিক বইয়ের প্রাচুর্যতা ছিল। নীলক্ষেতের বই বাজার থেকে বই কিনতে পারা হোক বা নাহোক, অভিজ্ঞতা হয়েছে কিছু। উপরে উল্লিখিত বিদেশী রাইটার, সায়েন্টিফিক বই কিংবা দূর্লভ যে বইগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো Marine Science, Oceanography বা সমুদ্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্য অবশ্যপাঠ্য বলা চলে। পাঠকের সুবিধার্তে তাই ২/১ টা বইয়ের নামও উল্ল্যেখ করছি- 1.Introduction to Oceanography, 2. Invitation to Oceanography, 3.Descriptive Physical Oceanography, 4.Essentials of Oceanography. ৫.আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান, ৬.সমুদ্রবিজ্ঞান.....ইত্যাদি,,, আরও আছে!

বইগুলো কিনতে বরাবরের মতোই কড়া নজর ছিল সায়েন্টিফিক আর বিদেশী বইয়ের দোকানগুলোতে। প্রথম কয়েকটা দোকানে বইয়ের নামগুলো বলে বই পেতে ব্যর্থ হলাম। উপান্তর না পেয়ে শেষে কাগজে লিখে বইয়ের খোঁজ করলাম। এতো কৌশল করেও ফলাফল শূণ্য। এ ধরণের বই সাধারণত নীলক্ষেতে বিক্রি হয়না, কারণ বিক্রেতাদের কাস্টমার পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়! তবে যেহেতু প্রযুক্তির যুগ, সেহেতু সফ্ট ফাইল থেকে প্রিন্ট করা বই পাওয়া সম্ভব, নতুবা নয়। 

কষ্টটা এখানে নয়, এক দোকানে গিয়েছি বই কিনতে বেচার দোকানী বইয়ের লিস্ট দেখে আমার দিকে একবার তাকাচ্ছিল, অন্যবার লিস্টের দিকে! কৌতুহল সংবরণ না করতে পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলো, "মামা, আপনি কি জিওগ্রাফীতে আসছেন?" আমি বললাম, না। আমি মেরিন সায়েন্সে পড়ি! এবার লিস্টটা গুলির বেগে আমার হাতেই ধরিয়ে দিলো! ভাবখানা এমন যে, মেরিন সায়েন্সের বই বিক্রি দোষের কাজ! আরেক দোকানি বইয়ের লিস্ট দেখে নামগুলো জোরে জোরে পড়ছেন আর বারবার ওশানোগ্রাফিকে ওখানোগ্রাফি উচ্চারণ করছেন! আমার একটু খারাপ লাগছিল বটে, তবে উনাকে বলে আসছিলাম যে, ওটা ওশানোগ্রাফিই হবে।

দেশীয় সমুদ্রচর্চার এই অবস্থা!! তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ এটা বইয়ের দোকান মাত্র। বইয়ের দোকানকে তো আর একটা দেশের সমুৃদ্রচর্চার নিয়ামক হিসেবে নির্ধারণ করা যায় না। তবে এটা উপলব্ধি করা যায় যে, সমুদ্রবিষয়ক বই পড়া হয় কম। বিদেশী বইই পাওয়া যাচ্ছে না আর দেশী ভাষায় লিখা বই চাওয়া তো পাপকাজ। তবে, সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে বাংলা ভাষায় লিখা দু'একটা বই আছে। 

সমুদ্রবিষয়ক উচ্চশিক্ষার প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠানটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। দেশ শুরুর সময় থেকেই এটা চালু আছে। এখন সেখানে তিনটা ডিসিপ্লিন আছে- মেরিন সায়েন্স,ওশানোগ্রাফি ও ফিশারিজ। এখান থেকে প্রতিবছর গ্র্যাজুয়েটও বের হচ্ছেন। নব্য প্রতিষ্টিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেউ কেউ পড়াচ্ছেনও! দেশে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান পড়ানো হয় এখন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেও আছে সমুদ্রবিজ্ঞানের কোর্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এগুলোতে সমুদ্রবিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আছে। আছে পুরো একটা মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়। বুয়েটে নেভাল আর্কিটেকচার ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং নামেও একটা ডিপার্টমেন্ট আছে। আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সমুদ্রবিজ্ঞানের সাথে যায় এমন। কিন্তু এদেশের সমুদ্রশিক্ষা এমন কেন? 

গবেষণার জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট আছে কক্সবাজারে। দেশের সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা এমন কেন?

২০১২ এবং ২০১৪ সালে দুই দফায় সমুদ্রবিজয় হয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ এখনও সেই সমুদ্রসীমার পূর্ণাঙ্গ পরিমাণটা জানে না। কেউ লিখে ১,১৮,৮১৩ বর্গ কি.মি., কেউ লিখে ১,২১,১১০ বর্গ কি.মি. আবার কেউ ১,১১০০০ বর্গ কিলোমিটারও লিখে!

A full map of Bay of Bengal. ©Sayedur R Chowdhury

দেশীয় সমু্দ্রসীমায় কী পরিমাণ লিভিং এন্ড নন-লিভিং রিসোর্স আছে কেউ জানে না। অথচ সমুৃদ্র বিজয় আর ব্লু-ইকোনমি দুইটা হাই ভোল্টেজ ইস্যু!! 

একবার এক সেমিনারে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন "নদীর অর্থনৈতিক ফলটা সবাই ভোগ করতে চায়। কিন্তু নদী দূষণের দায়বদ্ধতা কেউ নিতে চায় না। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষোভ আছে নদীর উপর!" 

ঠিক সমুদ্রের ক্ষেত্রেও তাই। সমুদ্রের দেয়া উপকরণ সবাই ভোগ করে বা সমুদ্রকে নানাভাবে ব্যবহার করে। এমন অনেকেই আছেন যারা জানেনই না সমুদ্র কিভাবে আমাদের সাহায্য করে যাচ্ছে! 

দেশে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় আছে,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আছে, স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় আছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় আছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আছে, আছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও আছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আছে ! দেশী-বিদেশী আরও অনেক সংস্থা আছে। কিন্তু সন্দেহ হয় কেউ কি দেশীয় সমু্দ্র ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করে?? 

বাংলাদেশে পরিকল্পনা কমিশনও আছে। নাই কেবল সমুদ্র এবং সমুদ্র সংক্রান্ত কোন মাস্টারপ্ল্যান! 

তবে কি এসব ঘাটতির জন্য একটা সমুদ্রবিষয়ক কমিশনই দায়ী যা আমাদের নাই! এসব বড় চিন্তা আমার ছোট মাথায় ধরে না! সমুদ্রবিষয়ক কমিশন গঠন করেই বা কি হবে? নতুন করে রাঘব বোয়াল যে তৈরী হবে না তার নিশ্চয়তা দিবে কে?? 

তবে যাই হোক বাংলাদেশে সমুদ্রসংক্রান্ত একটা মাস্টারপ্ল্যান অচিরেই তৈরীকরণ দরকার।

আজকে বিশ্ব সমুদ্র দিবস। শুধু সমুদ্র উপকূল নয়, বিশ্বের সব রাষ্ট্রই দিবস সম্পর্কে অবগত এবং সবাই নানান কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করছে। শুধু আমার দেশেই দেখি না সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান এই দিনে সমুদ্রসচেতনতা মূলক কোন প্রোগ্রাম করতে কিংবা আয়োজনের অংশীদার হতে। দেখি গুটিকয়েক ব্যক্তি কিংবা সংগঠন দিনটিকে ঘরোয়াভাবে পালন করতে। তবে কি সমুদ্রবিজয়ের পরই আমাদের দায়বদ্ধতা শেষ?

Coastal Zone of Bangladesh. ©Sayedur R Chowdhury
মাঝে মাঝে দেখি সরকারি ব্যবস্থাপনা আর প্রয়োজনীয় প্রয়োজনের জন্য বাজেট। জায়গার নাম পরিবর্তন নিয়ে বিশাল টাকার বাজেট হতে দেখি, কিন্তু সমুদ্র সংক্রান্ত কাজে ছোট অঙ্কেরও বাজেটও দেখিনি। 
আমরা কি আদৌ উন্নত হয়েছি কিংবা হতে পারবো?? 
সমুদ্রউপকূলীয় বিদেশী রাষ্ট্রের পরিকল্পনা দেখি যারা আয় করে সমুদ্র এলাকা থেকে। এই তারাই সমুদ্রকে দেশের অর্থনীতির ভালো নিয়ামক ভাবে এবং সেভাবে বাস্তবায়ন করে। 
বাংলাদেশও তো উপকূলতীরবর্তী দেশ। তবে কেন আমরা পারবো না। জাগো বাংলাদেশ, জাগো!

লিখেছেন- সৃজন পাল, শিক্ষার্থী।
স্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স এন্ড ফিশারিজ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

User Comments: