একুয়া নিউজ
বাংলাদেশে একুশ শতকের লাগসই মৎস্য প্রযুক্তি বিকাশে

দেশের সম্ভাবনাময় খাত মৎস্য ও সমুদ্রক্ষেত্রের উন্নয়নে দরকার কার্যকরী প্রদক্ষেপ

লেখকঃ সিরাজুম মুনিয়া   2018-07-15 14:06:30    Visited 745 Times

প্রতিটি দেশের কোন একটি ক্ষেত্রে বিশেষত্ব থাকে যার মাধ্যমে গোটা পৃথিবী তাকে চিনে এবং জানে। যেমন ইন্ডিয়া আইটি টেকনোলজির জন্য বিখ্যাত, সৌদি আরবের কথা বললে অবশ্যই তেলসম্পদের কথা বলতে হবে। আর বাংলাদেশের কথা বললে অবশ্যই এ দেশের মৎস্য সম্পদের কথা বলতেই হবে কারন “আমরা মাছে ভাতে বাঙালী”। তাছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ ইলিশ জি আই ( জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেটর) স্বীকৃত । মৎস্য এদেশের অর্থনীতিতে অনাদিকাল থেকে গুরত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে । কারন নদীমাতৃক বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য নদীনালা, খালবিল জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ১৬ কোটি মানুষের বিশাল জনসংখ্যার বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ যা বঙ্গোপসাগরের পাড়ে অবস্থিত এবং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর এলাকা যাকে গ্রীণ ডেল্টা বলা হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের আছে সবচেয়ে বড় নদী ব্যবস্থ্যা গঙ্গা-ব্রম্মপুত্র-মেঘনা রিভার সিস্টেম । উর্বর উপকূলীয় পরিবেশ থাকায় বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদে ভরপুর। মৎস্য এই দেশের জনসংখ্যার ৬০% আমিষের চাহিদা পূরণ করে। দেশের ১.৪ মিলিয়ন জনগণ সরাসরি মৎস্য সেক্টরের সাথে জড়িত এবং ১১ মিলিয়ন মানুষ পরোক্ষভাবে জীবিকার জন্য এই সেক্টরের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিযোগ্য পণ্য মৎস্য। তাহলে বলাই যায় মৎস্য সম্পদই হতে পারে দারিদ্রতা দূরীকরণের এবং অধিক জনসংখ্যার চাহিদা পূরণের অন্যতম মাধ্যম। 

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ একুয়াকালচারে মাছ উৎপাদনে বিরাট সফলতা অর্জন করেছে।  বর্তমানে একুয়াকালচারে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম। কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নেই, প্রচলিত নিয়মে চাষ করা হয়। দেশে কিছু সেমি ইনটেন্সিভ ফার্ম থাকলেও তেমন ইন্টেন্সিভ ( অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ) ফার্ম নেই বললেই চলে যা উন্নত দেশ গুলোতে দেখা যায়। তাছাড়া গবেষকদের গবেষনার ফলে একুয়াপনিক্স এবং রিসার্কুলেটরি একুয়াকালচার সিস্টেম একুয়াকালচারে আরেক নতুন ধারা যোগ হয়েছে যার ফলে পুকুর মাটি ছাড়াই ঘরে বহুতল ভবনে মাছচাষ করা সম্ভব । কিন্তু এই পদ্ধতিগুলো সবার নিকট পৌছে দেওয়ার জন্য কোন তৎপরতা নেই যাতে যে কেউ উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।

আমার মতে এইজন্য দরকার অনেক বড় বড় বিনিয়োগ। কিন্তু আমাদের দেশের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা আসলে কত টা আগ্রহী ? নাকি আমরা আগ্রহী করে তুলতে পারছি না ? ডিজিটাল বাংলাদেশের মোড়ক নিয়ে ঘুরছি কিন্তু এত বড় একটা সেক্টর  অনেকটাই আধুনিক প্রযুক্তিবিহীন। বড় বড় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছে পোশাক শিল্পের দিকে এবং আইটি ফার্মের দিকে। আর তাই ঢাকা শহরের উপর চাপ ক্রমশই বেড়েই চলছে। আর উৎপাদনের উৎস বিবেচনা করলে দেখা যায় পোশাক শিল্পের সমস্ত কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে কিন্তু মৎস্য উৎপাদনের সমস্ত উপাদান দেশীয়। তাই এতে অর্থনৈতিক ভাবে  দেশ আরো দ্বিগুন বেশি লাভবান হবে। 

বাংলাদেশ একটি উপকূলীয় দেশ যা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কিন্তু দরকার কার্যকরী ব্যবস্থ্যা এবং গবেষণার প্রসার। উপকূলীয় একুয়াকালচার আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশাল ভূমিকা রাখছে কারণ মৎস্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ৫৭% ই আসে উপকূলীয় চিংড়ি চাষ থেকে। কিন্তু চিংড়ি চাষেরও এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকাগুলো ঠিক ভাবে ব্যভার করতে পারছি না , তেমন সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫০% উপকূলীয় এলাকার নিকট বসবাস করছে। তাছাড়া ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছরে বিরাট সাফলতা অর্জন করেছে।  পৃথিবীর বড় বড় উন্নত শহরগুলো উপকূলসংলগ্ন এবং তারা উপকূলীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে এবং তাদের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থ্যার ও উন্নতি হচ্ছে। পৃথিবীর  উৎকৃষ্ট উপকূলীয় শহরগুলোর মধ্যে টোকিও (জাপান), নিউ ইয়র্ক ( ইউ এস এ), লস এঞ্জেলেস (ইউ এস এ), সাংহাই (চীন), বুয়েন্স আয়ার্স ( আর্জেন্টিনা),সাও পাওলো ( ব্রাজিল) অন্যতম। বাংলাদেশে ১৯ টি উপকূলীয় জেলা রয়েছে, আছে সুন্দরবন, কুয়াকাটা, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, চাদপুরের তিন নদীর মোহনা এবং নিঝুম দ্বীপের মত ইকোলোজিকেল হটস্পট, আছে আরো চারটি পোর্ট। কিন্তু আমরা কোন উৎকৃষ্ট উপকূলীয় নগরী গড়ে তুলতে পারছি না যেখানে আধুনিক জীবনযাপন এবং কর্মসংস্থানের বিশাল হবে এবং এতে গ্রাম থেকে লাখ লাখ লোকের ঢাকামুখীতা অনেক কমে আসতে পারত। এগুলো সম্ভাবনা কিন্তু দূরদর্শীতার অভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। উপকূলীয় এলাকার মানুষের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বেচে থাকতে হয় তাই প্রকৃতির উপরও হস্তক্ষেপ হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যেমন খুলনা, সাতক্ষীরার মানুষ ও সুন্দরবনের আশেপাশের এলাকার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য পুরোপুরি সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উজার করে চলছে চিংড়ি চাষ , একারনে বিগত কয়েক বছর ধরে সেখানে ধান চাষ ব্যহত হচ্ছে।  নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও অবাধে গাছ কাটা, হরিণ অন্যান্য পশুপাখি শিকার চলছেই, ম্যানগ্রোভ ও অনেক কমে যাচ্ছে যা আমাদের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা করে। বন মন্ত্রনালয় ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না কারণ মানুষের জীবিকার আর কোন মাধ্যম জানা নেই সেখানে। যেকোন সম্পদ কে সংরক্ষণ করতে হলে আগে তার যথাযথ ব্যবহার জানতে হয়। আমরা যদি আমাদের সম্পদ্গুলোর সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি তাহলে তা সংরক্ষণ করতে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন হবে না। এখানে সিল্ভোফিশারি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এতে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান দুই ই বৃদ্ধি পাবে এবং ম্যানগ্রোভের ও কোন ক্ষতি হবে না। তাছাড়া ইকোলজিকেল হটস্পট গুলোতে পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থ্যা নেই । কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিনে বর্তমানে সামুদ্রিক শৈবাল ( সী উইড) কালোচারে গবেষকরা সফলতার মুখ দেখেছে । এই সী উইড থেকে বার্গার,চিপ্স বিভিন্ন খাবার থেকে শুরু করে ঔষধ এবং বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিস তৈরি করা যায় যা উন্নত দেশে করা হচ্ছে। সমুদ্রজয়ের ফলে বাংলাদেশের আয়তন পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে । সম্প্রতি ভারতের কাছ থেকে পাওয়া ২৮,৪৬৭ বর্গ কি মি এবং মায়ানমার থেকে ৭০,০০০ বর্গ কি মি পাওয়ার পর বাংলাদেশের আয়তন ২,৪৬,০৩৭ বর্গ কি মি । বিগত বছরগুলোতে মেরিনে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোন সফলতা নেই। আমাদের দেশে মেরিকালচার এখনো শুরু হয়নি এর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার। মেরিন বায়োলজিস্ট  দের মতে একুয়াকালচারে যতটা সফল, মেরিনে আমরা ততটাই ব্যার্থ এবং গবেষণা কাজেরও কোন প্রসার নেই। এত বড় সমুদ্র সম্পদে আমাদের তেমন কাজের কোন অগ্রগতি নেই, আশার বাণী শোনালেও বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত খুব একটা নেই।

এত কিছুর পরেও আশার আলো হল সাগরের বিপুল জলরাশি ও এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক বিপ্লব গড়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদে সরকার এখন ব্লু  ইকোনোমি নিয়ে এখন তৎপর হয়েছেন । কিন্ত কতটা বাস্তবায়িত হবে তাই এখন দেখার বিষয়।  


সিরাজুম মুনিয়া

প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ ফিশারিজ কমিউনিটি ।


User Comments: