একুয়া নিউজ
বাংলাদেশে একুশ শতকের লাগসই মৎস্য প্রযুক্তি বিকাশে

বাংলাদেশের মৎস্য খামার যান্ত্রিকীকরণে ডিজিটাল প্রযুক্তি

লেখকঃ নিজস্ব প্রতিবেদক   2017-10-18 13:26:33    Visited 771 Times

বাংলাদেশের মৎস্যখাতের অবদান আজ সারা বিশ্বে স্বীকৃত। অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ৫ম স্থান দখল করে আসছে (FAO, ২০১৪ ও ২০১৫)।কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যে গ্রহণকৃত প্রাণিজ আমিষের ৬০%, মোট দেশীয় উৎপাদন বা জিডিপির ৩.৬৫% এবং মোট কৃষিজ আয়ের ২৩.৮১% আসে মৎস্যখাত হতে। এছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশের অধিকযা প্রায় ১ কোটি ৮২ লক্ষ মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য মৎস্যখাতের উপর নির্ভরশীল। গত তিন দশকে বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৫গুণ বাড়লেও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১৮ গুণ (DoF, ২০১৬)। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই রুইজাতীয় মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি পাঙ্গাস, কই, শিং, মাগুর, পাবদা ও তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এ নীরব বিপ্লবের অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনসাধারণ মাছ চাষে ব্যাপকহারে উৎসাহী হয়ে উঠেছে।মৎস্য চাষ একটি লাভজনক খাত হওয়ায় বড় বড় বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা মৎস্য খাতে বিনিয়োগ করছে। 

বাংলাদেশের মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা আজও সনাতন অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল। এ ব্যবস্থাপনায় মৎস্য চাষি তার মৎস্য খামার ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণরূপে মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপক ও অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল (চিত্র: ১)।  বর্তমানে দক্ষ শ্রমিকের অভাব, তাদের জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব এবং বিভিন্ন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমেরঅভাবে পরিবেশ দূষণ, মাছের রোগের বিস্তার ও মৎস্য উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি মৎস্য চাষিদের লাভের পরিমাণআনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্য খামারের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই এখন সময় এসেছে বিশ্বের সাথে সঙ্গতি রেখে আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে বাংলাদেশের মৎস্য খামারগুলো আধুনিকায়ন করে মৎস্য উৎপাদন সহনশীল ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। এতে করে মৎস্য খামারিরা একদিকে যেমন লাভবান হবে তেমনি অপরদিকে দেশও আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হবে।

তারই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মৎস্য খামারগুলোতেবিভিন্ন আধুনিক মৎস্যচাষ সম্পর্কিত যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে একটি ইন্টারনেট ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় (চিত্র-২)। এ ব্যবস্থাপনায় মৎস্য খামারের মৎস্য খাদ্য, পানি সঞ্চালন, এয়্যারেশন, পানির গুণগতমান পরীক্ষণের যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি (যেমন সিসিটিভি), অন্যান্য ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি (যেমন জেনারেটর, আলোর উৎস, পশুপাখি তাড়ানোর যন্ত্র), কর্মী ব্যবস্থাপনা মোবাইল ও ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি প্লাটফরমের মাধ্যমে স্মার্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব(চিত্রঃ ৩)। বাংলাদেশের মৎস্য খামারগুলোর আধুনিকীকরণের কৌশল সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো:


মৎস্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা যান্ত্রিকীকরণে অধুনিক প্রযুক্তি 

(Mechanization and automation of fish feed application)

মাছ চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিষয় হলো মাছের কৃত্রিম খাবার। মাছ চাষের খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ ভাগ খরচ হয় মাছের কৃত্রিম খাবার ক্রয়ের জন্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পরিমাণখাবার দেওয়ার কথা থাকলেও মৎস্যচাষীরা জ্ঞানের অভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের খাদ্য খাবার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় ও প্রয়োগ পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা না থাকায় অনুমান করে বিভিন্ন সময়ে মাছের খাবার প্রয়োগ করে থাকেন। এছাড়াও শ্রমিকেরা তাদের পরিশ্রম কমানোর জন্য অনেক সময় এক জায়গায় মাছের সকল খাবার প্রয়োগ করে থাকে। ফলে কখনও খাবারের স্বল্পতা আবার কখনও অধিক খাবার প্রয়োগের কারণে তা নষ্ট হয়ে পুকুরের পানি দূষিত হয়ে বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাসের সৃষ্টি হয়, অক্সিজেন স্বল্পতার ফলে মাছের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারেএবং মাছের কাক্সিক্ষত উৎপাদন ব্যাহত হয়। অটোমেটিক ফিস ফিডার (Automatic Fish Feeder) বা  স্মার্ট ফিসফিডার বা ই-ফিসারি ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা দূর করা যায়। এই ফিস ফিডার একটি প্রোগ্রামকৃত যন্ত্র। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পরিমাণ খাবার সুষম দূরত্বে সমহারে পুকুরে প্রয়োগ করা যায়। এতে সকল মাছের খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং শ্রমিক নির্ভরতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। এটি ম্যানুয়ালি ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় এবং প্রয়োগকৃত খাদ্যের ডাটাসমূহও সংরক্ষণ করা যায়। ফলে প্রতিদিন, প্রতিমাসে, প্রতিবছরে কোন পুকুরে কতটুকু খাবার দেওয়া হয়েছে এবং মোট খাবারের পরিমাণ সহজেইনির্ণয় করা যায়। এর সাথে সংযুক্ত বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে মৎস্য খামারের পরিবেশগত তথ্যাদি পাওয়া যায়। এই ফিডার ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের খাবারের অপচয়, শ্রমিক ব্যয় এবং মানবসৃষ্ট অন্য কোনো অসততা থেকে সহজেইমুক্ত থাকা সম্ভব। তবে এ প্রযুক্তি যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল উন্নয়ন পূর্বশর্ত।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এই ফিস ফিডার মৎস্য খামারগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে অ্যাকোয়া বাংলা এবং এসিআই লিঃ সীমিত পরিসরে এ অটোমেটিক ফিস ফিডার সরবরাহ করছে। এই ফিস ফিডার স্থাপন করে মাছচাষিরা একদিকে যেমন মাছের খাদ্য প্রয়োগের হার কমাতে সক্ষম হবেন অন্যদিকে পরিবেশ-প্রতিবেশও উন্নয়ন সাধিত হবে।


পানির গুণাগুণ পরীক্ষার সেন্সরসমূহ অটোমেশান 

(Automation of water analysis test kits)

সাফল্যজনক মাছচাষের পূর্বশর্ত হলো মাছের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু নিবিড় বা আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছচাষ করার ফলে যে দূষক পদার্থ তৈরি হয় তা পানির গুণাগুণের অত্যাবশ্যকীয়  বিভিন্ন প্যারামিটার, যেমন- PH, অক্সিজেন, তাপমাত্রা, অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত এবং পরিমাণ সম্পর্কে জানা যায়।একইভাবে এসেন্সর হতে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণকরেতাৎক্ষণিকভাবে অটোমেটিকবা ম্যানুয়ালি পানির যেসব গুণাগুণ উন্নয়ন প্রয়োজন; সেসবগুণাগুণ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন-এয়্যারেটর, পানির পাম্প প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যায় (চিত্র : ৬) এবং মৎস্য খামারের জৈব নিরাপত্তা (Bio-safety) নিশ্চিত করা যায়।

পানি সঞ্চালন ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ ও অটোমেশানকরণ

(Water distribution and exchange system mechanization and automation)

নিবিড় ও আধা নিবিড় মাছচাষে পানি পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিদিন বিভিন্ন পদ্ধতির/প্রজাতির মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমান পানি পরিবর্তনের মাধ্যমে নিবিড় ও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষের ফলে সৃষ্ট দুষক পদার্থসমূহ দূর করে পুকুরের পানির পরিবেশগত গুণাগুণ উন্নয়নের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মাছের রোগের প্রাদুর্ভাবও কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের মৎস্য খামারের পুকুর গুলোতে সাধারনত পাম্পের মাধ্যমে পানি পরিবর্তন করা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে এই পানি উত্তোলনের পাম্পগুলোকে সেন্সরের সাথে সংযুক্ত করে অটোমেশানের মাধ্যমে অধিক কার্যকরী করা যেতে পারে যেমন কোন কারণে পানির স্তর নেমে গেলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে কাঙ্খিত স্তর পর্যন্ত পূর্ণ করে দেবে অথবা পৃথিবীর যে কোন যায়গা থেকে স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে পাম্পটি পরিচালনা করা সম্ভব। পাম্পের ডাটাসমূহ সংরক্ষণ করে প্রতিদিন, প্রতিমাসে, প্রতি বছরে কোন পুকুরে কতটুকু পানি পরিবর্তন করা হয়েছে তা নির্ণয় এবং মোট উত্তোলিত পানির পরিমান ও ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমান নির্ণয় করা যায় এবং মৎস্য খামারের বিদ্যুৎ ব্যয় ও শ্রমিক নির্ভরতা কমানো যায়।

এয়্যারেশন ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ ও অটোমেশানকরণ

(Aeration system mechanization and automation)

নিবিড় ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানেরক্ষতিকর প্রভাবকে এয়্যারেশনের মাধ্যমে মৎস্যচাষের পুকুরে পানির প্রবাহ তৈরি ও দ্রবীভূত অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এয়্যারেশনের  মাধ্যমে মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, পানির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুণ উন্নয়ন, ক্ষতিকারক অ্যালজি ব্লুম নিয়ন্ত্রণ, পানির দুর্গন্ধ দূর, মাছের রোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাস এবং সর্বোপরি পুকুরের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের এয়্যারেটর পাওয়া যায়। এয়্যারেটরের সাথে অক্সিজেন সেন্সর সংযুক্ত করে অতি সহজেই যখন পুকুরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় তখন এয়্যারেটর চালু করে এবং অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিক হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে বিদ্যুৎ খরচ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো যায়। তাছাড়া অনলাইন ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে পুকুরে অক্সিজেনের পরিমাণজানা এবং অক্সিজেনের ঘাটতি দূরীকরণের উদ্দেশ্যে এয়্যারেটর পরিচালনা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাছের রোগ প্রতিরোধ ও ব্যাপক মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।

অন্যান্য যন্ত্রপাতিসমূহ অটোমেশানকরণ

(Automation of others equipment)

মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপনা যেমন ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি যেমন:সিসিটিভি (CCTV) ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে অটোমেশান করে মৎস্য খামারের সার্বক্ষণিক তথ্য ও চিত্রখামার উদ্যোক্তা তথা মালিক পেতে পারেন, যা খামারে তার বিনিয়োগের সুফলের নিশ্চয়তা প্রদান করে।এ ছাড়া নিরাপদ মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে GAP (Good Aquaculture Practice) ও Fish Value Chain অনুসরন ও ডাটা সংরক্ষণ তথা ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিতকরণ সহ মাছের e-marketing প্রবর্তণে এই অটোমেশান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। 

উপসংহার (Conclusion)

বাংলাদেশের মৎস্য খামারগুলিকে অনলাইন ভিত্তিক অটোমেশানের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব তথা ব্যয় সাশ্রয়ী করে তোলা সম্ভব। তাছাড়া সার্বক্ষনিক পর্যবেক্ষণ (Real Time Monitoring) এর মাধ্যমে মৎস্য খামারের জৈব নিরাপত্তা Bio-safety) নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব মৎস্য উৎপাদন করা যায়। তাছাড়া শ্রমিক নির্ভরতা কমিয়ে মৎস্য উৎপাদন খরচ কমানো যায়।সর্বোপরি মাছের উৎপাদন উলম্বভাবে (Vertical) বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছচাষে এক বিপ্লব ঘটানো যেতে পারে। 

[ড. মুহাম্মদ তানভীর হোসেন, সহকারী পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর; চৌধুরী সুজিত কুমার চাটার্জ্জী, মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, মৎস্য অধিদপ্তর এবং কৃষিবিদ মো: আসাদুজ্জামান আসাদ]


User Comments: