একুয়া নিউজ
বাংলাদেশে একুশ শতকের লাগসই মৎস্য প্রযুক্তি বিকাশে

বাংলাদেশে তেলাপিয়ার চাষ উন্নয়ন : বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষিত।

লেখকঃ ড. মোহাম্মদ গোলাম হোসেন   2017-08-27 17:25:06    Visited 3273 Times

ভূমিকা :

তেলাপিয়া একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন মাছ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে যেমন চীন, দক্ষিন ও পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, ল্যাটিন আমেরিকা এলাকায় স্বাদু ও লোনা পানিতে সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি আধানিবির পদ্ধতিতে চাষ করা যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে ১৯৫০ সালে তেলাপিয়ার মোট উৎপাদন ছিল ৩৭,৫০০ মে.টন, ২০১৫ সালে এসে যার উৎপাদন দাড়িয়েছে ৪৫,০০,০০০ মে:টন। বাংলাদেশে এ মাছটির উৎপাদন ২০০৫ সালের পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।  মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ সালে মোট উৎপাদন ছিল ২০,০০০০ মে:টন এবং ২০১৬ সালে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৪,০০,০০০ মে:টন। বর্তমানে বিশ্বের ১০ টি তেলাপিয়া উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ। তেলাপিয়ার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য যে কয়টি কারন উল্লেখযোগ্য হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে  তা হল ১৯৯৬ সালে গিফট তেলাপিয়ার জাত আমদানি, উন্নত গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং বাংলাদেশে ৪০০ টির বেশি তেলাপিয়া হ্যাচারী এবং ১৫,০০০ ছোট ও বড় আকারের বানিজ্যিক খামার স্থাপন। উন্নত চাষ ব্যবস্থাপনা সার্বিক ভাবে তেলাপিয়া উৎপাদনকে আরো বেগবান করেছে। দেশে উৎপাদিত তেলাপিয়ার সিংহভাগ দেশের অভ্যন্তরীন বাজারে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে যা আমাদের আমিষের যোগানে বিরাট শুন্যতার পুরণ করছে। বাকি মাছ কিছু পরিমান হলেও বৈদেশিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে।  আমাদের চিংড়ি ব্যতিত অন্যান্য মাছের প্রক্রিয়াজাতকরনে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকার কারনে আর্ন্তজাতিক বাজারে হিমায়িত তেলাপিয়া রপ্তানিতে দেশ পিছিয়ে আছে। আশা করি নিকট ভবিষ্যতে সরকারের সংশি-ষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে তেলাপিয়া চাষে আরো আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণে আরো সুবিধা বৃদ্ধি পাবে এবং তেলাপিয়া রপ্তানিতে এই দেশ গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে ও আশা অনুযায়ী বৈদেশীক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

১. বাংলাদেশে উন্নত জাতের তেলাপিয়া আমাদানি:

বাংলাদেশে ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে তেলাপিয়ার (Oreochromis mossambicus) জাত প্রথম আমদানি করা হয়। এই প্রজাতি দ্রুত প্রজননক্ষম, ঘন ঘন পোনা উৎপাদন এবং কম উৎপাদনশীল ও কাল বর্ণের কারনে চাষিদের কাছে বেশী জনপ্রিয়তা পায়নি। ফলে ১৯৭৪ইং সালে (UNICEF)) থাইল্যান্ড থেকে প্রথম তেলাপিয়া নাইলোটিকা গিফট এর চিত্রালাদা জাত আমদানি করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৮৭ সালে তেলাপিয়া নাইলোটিকা এবং ১৯৮৮ সালে থাইল্যান্ডের AIT থেকে তেলাপিয়ার লাল জাত আমাদানি করে। তেলাপিয়ার লাল জাতের অন্যটি ২০০৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। এর আগে ১৯৯৪ সালে বিএফআরআই ওয়ার্ল্ডফিশ সেন্টার প্রাক্তন (ICLARM)) থেকে Genetically Improved Farmed Tilapia (GIFT) আমদানি করে। পরবর্তীতে এর আর একটি উন্নত জাত ২০১২ সালে GIFT এর সর্বাধুনিক উন্নত জাত Aquaculture for Income and Nutrition (AIN) ওয়াল্ডফিশ বাংলাদেশ প্রজেক্টের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার জিত্রা স্টেশন থেকে আমদানি করা হয়। যা এর ১১ তম জেনারেশন। এছাড়াও FAST, GIFO, Genomar, SwanSea, YY female/ GMT (Fishgen) সংস্থা কর্তৃক উন্নত জাতের তেলাপিয়া জাত বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে।

(ক). জেনেটিক গবেষনার মাধ্যমে গিফট জাতের উন্নয়ণ :

তেলাপিয়া নাইলোটিকা এর গিফট জাতটি বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রীহিত ৮টি জার্মপ্লাজমের মধ্যে (Diallel Crossing) পদ্ধতিতে বেইজ পপুলেশন উৎপাদন করে পরবর্তীতে কয়েক জেনারেশন ম্যাস সিলেকশন প্রক্রিয়ায় ওয়ার্ল্ডফিশ সেন্টার কর্তৃক ফিলিপাইনে প্রথম উদ্ধাবন করা হয়। পরীক্ষামূলক গবেষনা কেন্দ্রের মূল্যায়নে ফিলিপাইনে স্বানীয় জাতের চেয়ে ৬০% বেশি দৈহিক বৃদ্ধি ও ৫০% বেশী বাচার হার প্রদর্শন করে। অনুরূপ মূল্যায়ন গবেষনায় বাংলাদেশেও বিএফআরআই ১৯৯৪ সালে এই জাত ৫৭% বেশী উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আরো উন্নত গবেষনার জন্য ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৫ সালে আরো দুটি উন্নত জাত মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন থেকে সংগ্রহ করে। এর পর বিএফআরআই ২০০৮-২০১২ সালের মধ্যে গিফট জাতকে আরো উন্নত জাতে পরিনত করার জন্য ১১ তম জেনারেশণ বাংলাদেশের প্রায় ২০০ টি হ্যাচারীতে সরবরাহ করা হয়। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ের গবেষনায় ১১ তম জেনারেশনটি বেইজ পপুলেশন থেকে গড়ে ৩৯.২৫% বেশী উৎপাদন বলে প্রমানিত হয়।

(খ). তেলাপিয়া ব্রিডিং নিউক্লিয়াস  স্থাপন :

 তেলাপিয়ার অধিক উৎপাদনশীল গিফটজাত উন্নয়ন ও বিতরনের পাশাপাশি দেশে বর্তমানে ৪০০ টির বেশী তেলাপিয়া হ্যাচারী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে তেলাপিয়ার ব্রুড ব্যবস্থাপনা ও বিতরনে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হয়েছে। এই অবস্থায় পোনা উৎপাদনে একই ব্রুডের বারবার ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত প্রজনন ও ব্যাপক হারে হ্যাচারীতে ব্রুড ব্যবহারে অন্ত-প্রজননের (Inbreeding) সৃষ্টি করেছে। এ সকল সমস্যার কারনে হ্যাচারী থেকে ভাল মানের পোনার উৎপাদন ব্যর্থ হচ্ছে। তেলাপিয়া হ্যাচারীসমূহের বর্তমান অব্যবস্থাপনা উন্নত মান সম্পন্ন তেলাপিয়া পোনা উৎপাদনে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা হিসাবে গন্য করা হয়।

 উপরোল্লিখিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে WorldFish Bangladesh, RFLDC, DANIDA,M CSISA-BD, AIN প্রজেক্টের মাধ্যমে ২০১২- ২০১৬ ইং সালে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, যশোর, নড়াইল, লক্ষীপুর, বাগেরহাট ও বড়গুনায় মোট ৭টি তেলাপিয়া ব্রিডিং নিউক্লিয়া স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে AIN ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশ প্রজেক্টের মাধ্যমে ৫টি টিবিএন স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থিত সকল টিবিএন সেন্টারে AIN প্রজেক্টের আওতায় শুধু মালয়েশিয়া থেকে আগত ১১ তম জেনারেশনের উন্নত গিফট জাত ব্যবহার করা হয়েছে। উলে-খ্য যে এই গিফট জাতের ৫৬ টি ফ্যামিলির প্রতি ৭টি ফ্যামিলির সহকারে গঠিত মোট ৮টি কোহর্টের জার্মপ্লাজম ৮টি পুকুরে রাখা হয়েছে। যা থেকে- Selective

Breeding এবং Rotational Breading পদ্ধতির মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উন্নত জাতের ব্রুডস্টক উৎপাদন ও বিতরনের কাজ চলমান রয়েছে।

তেলাপিয়ার বানিজ্যিক হ্যাচারী স্থাপন এবং সব পুরুষ মনোসেক্স তেলাপিয়া পোনা উৎপাদন :

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে উন্নত গিফট জাতের ব্রুড আমদানি এবং BFRI এর আরো উন্নত গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় পরিবেশে অধিক ফলনশীল গিফট জাতের তেলাপিয়ার সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে এদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে বি-বাড়িয়া, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নোয়াপাড়া, বগুড়া, রাজশাহীতে তেলাপিয়া হ্যাচারী স্থাপনের উদ্যোগ ব্যপক হারে পরিলক্ষিত হয়। ইত্যোমধ্যে এই সকল এলাকায় মোট ৪০০টির ও বেশী হ্যাচারী স্থাপিত হয়েছে। এ সকল তেলাপিয়া হ্যাচারীর ডিজাইনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় BFRI এর তত্ত্বাবধান প্রশংসার দাবী রাখে। পাশাপাশি ব্রাক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তেলাপিয়া হ্যাচারী স্থাপন করায় এর বিস্তার দ্রুততার সাথে সম্ভব হয়েছে। এই সকল হ্যাচারী থেকে উৎপাদিত মনোসেক্স তেলাপিয়া পোনা স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ % এর বেশী উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সকল বানিজ্যিক হ্যাচারী থেকে বছরে মোট ৫০০ কোটির বেশী তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত হ্যাচারী গুলোতে ওয়ার্ল্ডফিশ পরিচালিত প্রজেক্টের মাধ্যমে পরিচালিত ব্রিডিং নিউক্লিয়াস সমূহ উন্নত গিফট জাত মাল্টিপ্লাইয়ার হ্যাচারীতে সরবরাহ করা হবে এবং তা থেকে ব্রুড সরবরাহের মাধ্যমে বানিজ্যিক হাচারীতে মনোসেক্স সব পুরুষ জাত পোনা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বানিজ্যিক তেলাপিয়া খামার প্রতিষ্ঠা এবং চাষ উন্নয়ন :

 তেলাপিয়ার জাত উন্নয়ন, অধিক সংখ্যক হ্যাচারী স্থাপন এবং সব মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদনের পাশাপাশি তেলাপিয়া চাষাবাদের প্রজেক্ট বাড়ার জন্য ২০০০ সালের পর থেকে প্রচেষ্টা বাড়াতে থাকে। সরকারী ভাবে যদিও বানিজ্যিক তেলাপিয়া খামার স্থাপনের সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারন সম্ভব হয়নি। তথাপি মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউটের হিসাব মতে বাংলাদেশে প্রায় ১৫,০০০ বানিজ্যিক খামার পরিচালিত হচ্ছে। আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে পৃথিবীর ১০ টি অধিক উৎপাদনশীল দেশের মধ্যে তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৪র্থ। এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে দেশের দক্ষিন অঞ্চল বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপকুলীয় চিংড়ী চাষে রোগবালাই সংক্রামনের কারনে চাষীরা চিংড়ি চাষে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি খামার গুলোতে বিকল্প হিসাবে তেলাপিয়ার চাষ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা যাচ্ছে সবকিছু সঠিক ভাবে চললে স্বাদু পানি ও আধালোনা পানির ইকোসিস্টেমে বানিজ্যিক চাষের ব্যাপকতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

 লেখক:

সাবেক মহা-পরিচালক

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বাংলাদেশ ব্লু- ইকোনোমি বিশেষজ্ঞ

পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।


User Comments: